শিলিগুড়ি, ১৬ অক্টোবর : ইতিহাস, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজসেবার মেলবন্ধনে শিলিগুড়ির অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আনন্দময়ী কালীবাড়ি। এবার ৯৬তম বর্ষে পা রাখতে চলেছে আনন্দময়ী কালীবাড়ির দুর্গাপূজা। তাই এবারের শারদোৎসব ঘিরে ভক্তদের মধ্যে রয়েছে বাড়তি উন্মাদনা। শতবর্ষের ঐতিহ্যকে স্মরণে রেখে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
আনন্দময়ী কালীবাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি এবং প্রখ্যাত চারণ কবি মুকুন্দ দাসের অবদান। কথিত রয়েছে, ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ পুলিশের নজর এড়িয়ে বরিশালের চারণ কবি মুকুন্দ দাস শিলিগুড়িতে এসে আশ্রয় নেন। সেই সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ছোট্ট ও জীর্ণ মন্দিরটির অবস্থা দেখে তিনি ব্যথিত হন। এরপর স্বদেশি গান, অভিনয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দান করে এবং স্থানীয় মানুষকে উৎসাহিত করে মন্দিরটিকে পাকা করার উদ্যোগ নেন তিনি।
পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে মন্দিরে কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং মন্দিরের নামকরণ হয় ‘আনন্দময়ী কালীবাড়ি’।
এরপর ১৯৩২ সাল থেকে এই মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয় দুর্গাপূজা। সেই সময় পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মন্দির চত্বরে ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারি থাকলেও, জনশ্রুতি অনুযায়ী, পূজার আড়ালে এখানে বিপ্লবীদের গোপন বৈঠক এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা কর্মকাণ্ড চলত। ফলে আনন্দময়ী কালীবাড়ি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক স্থান হিসেবেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
আনন্দময়ী কালীবাড়ির দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ দেবীর ভোগ প্রসাদ বিতরণ। শিলিগুড়ি শহর ছাড়িয়ে মহকুমার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে এই পূজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মাবুয়া, নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া, ঘোষপুকুর, হাঁসিখাওয়া, রামধনজোত ও রবীন্দ্রনগর-সহ অন্তত ৬০টি গ্রামের মানুষ দেবীর ভোগ প্রসাদ গ্রহণ করতে মন্দিরে আসেন।
পূজার দিনগুলিতে ভোর ৪টে থেকেই মন্দির চত্বরে ভক্তদের ভিড় জমতে শুরু করে। দেবীর প্রসাদ পাওয়ার আশায় দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। চালের খিচুড়ি-সহ বিভিন্ন ভোগ প্রসাদ বিতরণকে ঘিরে প্রতি বছরই তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই প্রসাদ বিতরণ কর্মসূচি বহু মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে আনন্দময়ী কালীবাড়ি কমিটি। চা-বাগানের দুস্থ শ্রমিক ও শিশুদের পাশে দাঁড়াতে পোশাক বিতরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই দুটি চা-বাগানের শ্রমিক ও শিশুদের হাতে পোশাক তুলে দেওয়া হয়েছে। শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে আগামী দিনে আরও কয়েকটি চা-বাগানে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে থিম ও জাঁকজমকের প্রতিযোগিতায় যখন দুর্গাপূজার আয়োজন আরও বর্ণময় হয়ে উঠছে, তখন আনন্দময়ী কালীবাড়ি তার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছে। চারণ কবি মুকুন্দ দাসের স্মৃতিবিজড়িত এই মন্দিরের ৯৬তম দুর্গাপূজা তাই শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং শতবর্ষের ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, বাংলার সংস্কৃতি এবং মানবসেবার এক অনন্য মেলবন্ধন।